শনিবার, এপ্রিল ১৩, ২০২৪
Led02ফতুল্লাবিশেষ প্রতিবেদন

‘আক্তারুজ্জামান’দের কারণে বাঁধাগ্রস্থ হচ্ছে সরকারের মহতী উদ্যোগ

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, লাইভ নারায়ণগঞ্জ: ‘চাঁদের আলো’ মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পূর্ণবাসন কেন্দ্রে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জ জুড়ে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি করেছে। মাদকাসক্তি পূর্ণবাসন কেন্দ্র গুলোতে চিকিৎসা নিতে দেওয়া প্রিয়জনদের নিয়ে শঙ্কায় আছে স্বজনরা। চাইছেন অভিযুক্ত মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের চেয়ারম্যান মো. আক্তারুজ্জামান পাটোয়ারীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার। যাতে ভবিষ্যতে এমন নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।

অসীম ধৈর্য নিয়ে দিনের পর দিন প্রচেষ্টায় মাদকাসক্তি থেকে ফেরানোর বিধান করে বাংলাদেশ সরকার বেসরকারি পর্যায়ে মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পূর্ণবাসন কেন্দ্রের অনুমোদন দেয়। এমন দু-একটি প্রতিষ্ঠানে যখন মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তখন নিয়ম মেনে পরিচালিত কেন্দ্র গুলোও প্রশ্নের সম্মুখিন হয়। পাশাপাশি সরকারের মহতী এই উদ্যোগ বাস্তবায়নেও সৃষ্টি হয় বাঁধা।

নারায়ণগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসের এক কর্মকর্তা বলছেন, ‘নির্যাতনের ঘটনাটিকে যেভাবেই ব্যখ্যা দেওয়া হোক না কেন, কেন্দ্রের ভেতরে চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তির সাথে যা হয়েছে তা উচিত হয়নি। আইনেও চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিদের উপর লাঠি ব্যবহারের কোন বিধান নেই। তাই অবশ্যই প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান অপরাধী।’

এরই মধ্যে ‘চাঁদের আলো’র চেয়ারম্যান মো. আক্তারুজ্জামান পাটোয়ারীকে শোকজ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে, ‘শাসন’ বলে দাবি করছে চাঁদের আলোর মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্রের অভিযুক্ত চেয়ারম্যান। তারা উল্টো ‘ভিডিওটি প্রকাশ করা’য় জড়িতের শাস্তির দাবি করছেন।

চাঁদের আলো মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের নির্যাতনের ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার একদিন পর মঙ্গলবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে যান নারায়ণগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসের একটি প্রতিনিধি দল। নারায়ণগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসের উপ-পরিচালক মোহাম্মদ মামুন এতে নেতৃত্বদেন।

মোহাম্মদ মামুন লাইভ নারায়ণগঞ্জকে জানান, ‘চাঁদের আলো’ নামের মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পূর্ণবাসন কেন্দ্রের ভেতরে যুবককে নির্যাতনের ভিডিওটি ৪ সেপ্টেম্বর রাতে নজরে আসে তাদের। সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিযুক্ত ও মারধরের শিকার ব্যক্তিদের সাথে কথা বলেছেন। পাশাপাশি নিরাময় কেন্দ্রের ভেতরের অন্যান্য রোগীদের বক্তব্যও গ্রহণ করি। প্রতিষ্ঠানটিকে শোকজ করা হয়েছে। তাদের জবাব আসলে; সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির ভেতরের একটি রুমে উচ্চ শব্দে ইংরেজি গান চলছে। সেই রুমে ৫ থেকে ৭ জন ব্যক্তির সহযোগীতায় দুই যুবককে চেপে ধরে লাঠি দ্বারা মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতন করছে ‘চাঁদের আলো’র চেয়ারম্যান মো. আক্তারুজ্জামান পাটোয়ারী। উচ্চশব্দে সেখানে চলছিল ইংরেজি গান। গানের আড়ালে চাপা পড়ছে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের শিকার যুবকদের কান্না।

‘চাঁদের আলো’ কর্তৃপক্ষ দাবি করছে নির্যাতনের শিকার যুবকরা মাদকাসক্ত। চিকিৎসার জন্য তাদরে ‘চাঁদের আলো’ মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পূর্ণবাসন কেন্দ্রে ভর্তি করেছিল পরিবারের সদস্যরা। ৩ মাস পূর্বে যুবকরা দেওয়াল ভেঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে শাসন করেছিল প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান মো. আক্তারুজ্জামান পাটোয়ারী।

ভুক্তভোগী যুবকরা এখনও প্রতিষ্ঠানটিতে চিকিৎসাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে। তাই কোন অভিযোগ করতে চাইছে না তারা। বলছেন, রাগ-ক্ষোভ কিংবা অভিযোগ নেই তাদের।

২০০৫ সালে বেসরকারী পর্যায়ে মাদকাসক্তি পরামর্শ কেন্দ্র, মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ও মাদকাসক্ত পূনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা বিধিমালা প্রণোয়ন করা হয়। ২০১৭ সালে সংশোধন করা হয়েছে বিধিমালা। সেখানে কোথাও ‘চিকিৎসার নামে নির্যাতন বা মারধরের’ নিয়মের কথা উল্লেখ নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নারায়ণগঞ্জ জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসের এক কর্মকর্তা লাইভ নারায়ণগঞ্জকে জানান, যেভাবেই ব্যাখ্যা দেওয়া হোক না কেন? ঘটনাটি কেন্দ্রের ভেতরে চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তির সাথে হয়েছে। কোন চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিদের উপর লাঠি ব্যবহারের কোন বিধান আইনেও নেই। তাই অবশ্যই প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান অপরাধী।

দেশে আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের সংখ্যা। একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তি নিজেরা যেমন বিপদগ্রস্ত হচ্ছে, একই সাথে তারা বিপর্যস্ত ও হতাশ করে তোলে তাদের পরিবারের সদস্যদের। তাই বাংলাদেশ সরকার সরকারির পাশাপাশি বেসরকারী পর্যায়ে মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র ও পূনর্বাসন কেন্দ্র পরিচালনার অনুমোদন দিচ্ছে। অসীম ধৈর্য নিয়ে দিনের পর দিন প্রচেষ্টা চালিয়ে মাদকাসক্তি থেকে ফেরানোর বিধান থাকলেও নির্যাতনের এমন ঘটনা প্রকাশ পেলে প্রিয় স্বজন হারানোর ভয় কাজ করে স্বজনদের মধ্যে।

সুনামের সাথে ২২ বছর যাবত নারায়ণগঞ্জে নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনা করে আসছে ‘প্রয়াস’। প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ও সরকারের মহতী উদ্যোগ প্রশ্নবৃদ্ধ হচ্ছে জানিয়ে প্রয়াসের প্রোগ্রাম অফিসার তানভীর আরফিন রনি লাইভ নারায়ণগঞ্জকে জানান, ভিডিওটি নজরে আসার পরই আমরা নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ আলোচনা করেছি। আলোচনায় সিদ্ধান্ত নিয়েছি মাদকাসক্তি কেন্দ্র গুলোর মান উন্নয়নে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অফিসে জোড়ালো দাবি তুলবো।

 

পূর্বের নিউজ পড়তে ক্লিক করুন

মাদকাসক্তি চিকিৎসা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান ‘মাদক সেবী’, চিকিৎসার আড়ালে মধ্যযুগীয় নির্যাতন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

RSS
Follow by Email