সোমবার, এপ্রিল ২২, ২০২৪
মতামত

তাজারীন গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ড: বিচারহীনতার ১ যুগ

বিগত ১ যুগেও তাজরীন গার্মেন্টে অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী দোষীদের বিচার এবং শাস্তি না হওয়ায় এটাই প্রমাণ করে, অপরাধ যত গুরুতর হউক না কেন প্রচলিত আইনে এই ধরণের মর্মান্তিক অপরাধের বিচার করা সম্ভব নয়। আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টে ২০১২ সালে ২৪ নভেম্বর রাতে কলাপসিবল গেইটে তালা লাগানো অবস্থায় আগুনে পুড়ে এবং প্রাণ বাঁচাতে লাফিয়ে পড়ে ১১৪ জনের মৃত্যু ঘটে। পরে পঙ্গু চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো ৭ জন, মোট ১২১ জনের প্রাণহানী ঘটে । আমরা সকলেই জানি অপরাধের বিচার বা শাস্তি না হলে ঐ অপরাধের প্রবনতা আরও বেশি বেড়ে যায় এবং অপরাধীরা অপরাধ করার জন্য উৎসাহিত হয়। বিচারহীনতা, অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়িয়ে তোলে। যার কারণে এর ঠিক ৫ মাস পরেই রানা প্লাজা ধ্বসে ১১২৪ জনের মৃত্যু হয়। স্পেকট্রাম, চৌধুরী নীট ওয়্যার, মাল্টিফ্যাবস, ট্যাম্পাকো এবং সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের হাসেম ফুডে ৫৪ জনের মৃত্যু ঘটে। এই পর্যন্ত কোনো কল-কারখানায় শ্রমিক মৃত্যুর জন্য দায়ী-দোষীদের বিচার বা শাস্তি হয়নি। প্রচলিত আইন ও পারিপার্শ্বিকতার চাপে তাৎক্ষনিকভাবে মামলা হলেও আইনের দুর্বলতার কারনে অভিযুক্তদের কোন শাস্তিই হয় না।

তাজরীন গার্মেন্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান করার জন্য ঘটনার পর-পরই সরকারি বিভিন্ন সংস্থা থেকে কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রতিটি অনুসন্ধানেই মালিক-কর্তৃপক্ষের শ্রমিক নিরাপত্তা বিষয়ে সার্বিক অবহেলার চিত্র তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন’। এই প্রতিবেদনের সুপারিশমালায় বলা হয়েছে, “তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেড-এ সংঘটিত এই মর্মান্তিক মৃত্যুর বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। যা দেশে এবং বিদেশে ব্যাপকভাবে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আগুন লাগার বিষয়টি নাশকতা হতে পারে, তবে এত সংখ্যক মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য মালিকের অমার্জনীয় অবহেলাই দায়ী। এটি সুস্পষ্ট ভাবে অবহেলাজনিত মৃত্যু ঘটানোর অপরাধ। তাই তাজরীন ফ্যাশন লিমিটেড এর মালিককে দন্ড-বিধির ৩০৪ (ক) ধারায় আইনের আওতায় এনে বিচারে সোপর্দ করার সুপারিশ করা হলো।” এই পরিপ্রেক্ষিতে মালিকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দুইটি মামলা করা হয়। একটি মামলা দায়ের করেন একজন নিখোঁজ শ্রমিকের ভাই। আশুলিয়া থানার পুলিশ বাদী হয়ে অপর মামলাটি দায়ের করে। আশুলিয়া থানার মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন তিন জন। তারা ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর, ৩২৩/৩২৫/৪৩৬/৩০৪-ক/৩৪ (দ) দণ্ডবিধিতে সিএমএম কোর্টে অভিযোগপত্র (চার্জশীট) দাখিল করেন। অভিযোগ পত্রে সাক্ষী করা হয়েছিল ১০৪ জনকে। পরবর্তীতে ৩ সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে অবহেলাজনিত হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত মালিক মো. দেলোয়ার হোসেনসহ ১৩ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয় এবং সাক্ষ্য গ্রহণ প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৫ সালের ১ অক্টোবর। ২০১৫ সালের অক্টোবর মাস থেকে এই আট বছরে সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য সর্বমোট ৭৭ টি তারিখ ধায্যর্ ছিলো। এই ৭৭ তারিখের মধ্যে মাত্র ৯ টি তারিখে রাষ্ট্রপক্ষ সাক্ষী হাজির করেছে। রাষ্ট্রপক্ষ এখনও ৯৫ জন সাক্ষী হাজির করতে পারেনি এবং অধিকাংশ সাক্ষীকে প্রস্তুত না করেই আদালতে উপস্থাপন করা হয়, যার কারনে সাক্ষ্য দূর্বল হয়ে পরে।

প্রকৃত পক্ষে এত বড় ঘটনা, যেখানে শতাধিক বা সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানীর ঘটনা ঘটে সেক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৩০৪ ধারায় অবহেলাজনিত আইনে এ ধরণের গুরুতর অপরাধের বিচার করা সম্ভব নয়। ১ জন মানুষকে যদি কেউ হত্যা করে তবে হত্যাকারীর যাবজ্জীবন বা ফাঁসির আদেশ হয়। কিন্তু একজন মানুষ যদি একসাথে ১ হাজার মানুষকে হত্যা করে এর বিচার বা শাস্তি একই রকম আইন দ্বারা সম্ভব নয়। অপরাধের মাত্রা, ধরন পরিবর্তনের সাথে সাথে ন্যায় বিচারের উদ্দেশ্যে আইনের যুগোপযোগী পরিবর্তন অপরিহার্য। যেমন, নারী শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবুন্যাল, বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইন ইত্যাদি তৈরি করা হয়েছে, তেমনিভাবে শিল্প কারখানায় শত-সহস্র প্রাণহানিতে দায়ী-দোষীদের বিচারের জন্য বিশেষ আইন এবং স্পেশাল ট্রাইবুন্যাল গঠন করা এখন সময়ের দাবি।

একজন শ্রমিকের জীবনের মূল্য কত? টাকার অঙ্কে মানুষের জীবনের মূল্য হয় না। একজন শ্রমিক এই ধরণের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করলে এক জীবন আয়ের সম-পরিমাণ ক্ষতিপূরণ প্রদান অপরিহার্য। তাজরীন এবং রানা প্লাজায় আহত পঙ্গু শ্রমিকরা এখন চিকিৎসার অভাবে কষ্ট যন্ত্রণায় মানবেতর দিন যাপন করছে। আহত-পঙ্গু শ্রমিকদের এখন পর্যন্ত সুচিকিৎসা এবং পুনর্বাসন না করে মানবাধিকার লঙ্ঘন করে চলছে।

২০২০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তাজরীন গার্মেন্টের অগ্নিকান্ডে মারাত্মক আহত হয়ে কর্মক্ষমতা হারানো প্রায় দেড় শতাধিক শ্রমিক তাদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও পূনর্বাসনের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুর করে। এরপর শ্রমিকরা প্রায় ৩ মাস (৮১ দিন) বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান অব্যাহত রাখেন। কিন্তু ৭ ডিসেম্ভর ২০২০ মধ্য রাতের পর শ্রমিকদের জীবনের উপর অমানবিক ও বর্বর হামলা চালায় রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনী। গভীর রাতে ঘুমন্ত নারী পুরুষ শ্রমিকদের উপর সাউন্ড গ্রেনেট, কাদানে গ্যাস, নির্বিচার লাঠি চার্জ করে প্রায় অর্ধশতাধিক শ্রমিককে মারাত্মক আহত করে প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে তাড়িয়ে দেয়। অথচ অবস্থান কর্মসূচি চলা অবস্থায় কলকারখানা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রেস ক্লাবের সামনে এসে মারাত্মক আহত শ্রমিকদের তালিকা তৈরি করে এবং ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রম্নতি দেয়।

শ্রম-প্রতিমন্ত্রী কল-কারখানা ও অধিদপ্তর ও বিজিএমইএ বহুবার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্রম্নতি দিলেও তা তারা রক্ষা করে নাই। কর্মক্ষমতা হারানো আহত শ্রমিকরা যেই তিমিরে ছিলেন সেই তিমিরেই রয়ে গেছেন।
ক্ষতিপূরণ কত হওয়া উচিত সেটা নিয়ে নানা হিসাব আছে। যুক্তরাষ্ট্রে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষারত কয়েকজন প্রবাসী শিক্ষার্থী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন পদ্ধতি ও দেশের বিদ্যমান মজুরি কাঠামো বিশ্লেষণ করে ক্ষতিপূরণের একটি ছক দিয়েছেন। তাতে ক্ষতিপূরণ দাঁড়ায় প্রায় ৯ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৫৪ লাখ টাকা। তাজরীন ফ্যাশন্স এ অগ্নিকান্ডে সময়েই অর্থনীতির অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ লিখেছিলেন, ১৮৫৫ সালের চরম দুর্ঘটনা আইন অনুযায়ী গড়ে কম করে ধরলেও ক্ষতিপূরণ দাঁড়ায় ৪৮ লাখ টাকা।

অন্যদিকে, আইএলওসহ আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশের মজুরি কাঠামো বিবেচনা করে পরিবার প্রতি ক্ষতিপূরণ দাড়ায় প্রায় ২৮ লাখ টাকা। রানা প্লাজা ধ্বসের পর মহামান্য হাইকোর্ট এক রীট পিটিশনে নবম পদাতিক বাহিনীর জিওসিকে প্রধান করে ৩১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করে। সেই কমিটিতে ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত কমিটির আহ্বায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম. এম আকাশ মহামান্য হাইকোর্টে তাদের গবেষণার রিপোর্ট প্রদান করেন যেখানে নিহতের ক্ষতিপূরণের প্রস্তাব করা হয়েছে ২৮ লক্ষ টাকার উপরে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডে কর্মকর্তাসহ ৫৩ জন সেনা সদস্য নিহত হয়েছিলেন। যতটুকু জানা যায় চাকরির অন্যান্য সুযোগ সুবিধা বাদে বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে ৪০ লক্ষ টাকার উপরে প্রতি জনের পরিবারকে দেয়া হয়েছিল। স্বাভাবিক ভাবেই যুক্তি আসে, দেশের রপ্তানি আয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এবং মুনাফা অর্জনের শীর্ষে থাকা পোশাক শিল্প শ্রমিকরা ক্ষতিপূরণ তার চেয়ে কম পাবে কেন? গার্মেন্টস শিল্প শ্রমিকদের জন্য একটি আন্তর্জাতিক কল্যাণ তহবিল গঠনের প্রস্তাব বহু আগে থেকেই করা হয়েছে। কিন্তু মালিকদের অনাগ্রহের কারণে এটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। বিদেশি ক্রেতা (বায়ারদের) সাথে ক্ষতিপূরণ বা কল্যাণ তহবিল নিয়ে বার্গেনিং করার মত দেশে অনেক ব্যক্তিত্ব থাকার পরেও মালিক পক্ষ সে সুযোগ কাজে লাগায়নি। বাংলাদেশ শ্রম আইনে একজন শ্রমিকের মৃত্যুর জন্য ২ লক্ষ টাকা ক্ষতি পূরণের বিধান আছে । শ্রম আইনের এই দিকটি বিবেচনা করলেই বুঝতে পারা যায় বাংলাদেশের শ্রমিকদের রাষ্ট্রীয়ভাবে কি পরিমাণ অবহেলায় রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের চেয়েও অনেক ছোট রাষ্ট্রে শ্রম আইনে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিহতের জন্য ৫০ লক্ষ টাকা থেকে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের উদাহরণ আছে।

লেখক-
এড. মাহবুবুর রহমান ইসমাইল, শহীদুল ইসলাম সবুজ, শবনম হাফিজ
(শ্রমিক সংগঠক)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

RSS
Follow by Email